শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬, ১১:২৪ অপরাহ্ন

সখিপুরে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী  মাটির ঘর

সংবাদ দাতার নাম
  • প্রকাশের সময় : বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬
  • ৫২ বার পড়া হয়েছে
জনতার কন্ঠ ডেস্ক
মাটির ঘরে বসবাস করেই জীবনের সিংহভাগ সময় পাড় করছেন আনোয়ারা খাতুন। এখনো তাঁর স্বামীর রেখে যাওয়া মাটির ঘরেই বসবাস করছে। তাঁর সাজানো গোছানো সংসারের সবকিছুর মধ্যে মাটির ঘরটিই যেনো তাঁর কাছে শান্তিনীড়। আনোয়ারা খাতুনের (৭৫) ভাষ্য মতে সুদীর্ঘ প্রায় ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে তিনি মাটির ঘরে বসবাস করেছে। তিনি সখিপুর উপজেলার গজারিয়া ইউনিয়নের পাথারপুর গ্রামের মৃত আমির উদ্দীনের সহধর্মিণী। তাঁর স্বামী মারা গিয়েছে প্রায় ২০ বছর হবে। বর্তমানে মাটির ঘরটিই তার সুখ দুঃখের কেন্দ্রবিন্দু।
ঠিক একই রকম চিত্র দেখা গিয়েছে হতেয়া রাজাবাড়ী গ্রামে। হতেয়া গ্রামের মৃত রমিজ উদ্দিনের সহধর্মিণী আনোয়ারা বেগম (৭০) সারা জীবন ধরেই মাটির ঘরে বসবাস করে আসছে। এখনো তিনি তার জীবনের শেষ সময়টুকু মাটির ঘরকে কেন্দ্র করে পার করছেন। স্বামী মারা গিয়েছে প্রায় এক যুগেরও বেশী সময় হয়ে গেছে। তার জীবনের সকল সুখ দুঃখের আলো ছায়ার সঙ্গী যেনো এই মাটির ঘর। তার জ্যেষ্ঠ কন্যা নাজমা আক্তারের ভাষ্যমতে, মাটির ঘরটিই হলো আমার মায়ের কাছে আনন্দ বেদনার সঙ্গী।আধুনিকতার ছোঁয়ায় মানুষের বসবাসের ক্ষেত্র পরিধি দিন দিন সম্প্রসারিত হচ্ছে। মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটছে। তুবও মানুষের জীবনের পথ চলায় অতীত স্মৃতিগুলো ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে। অতীত স্মৃতিগুলোকে জীবনের সঙ্গী করেই মানুষের পথচলা সৌন্দর্যমন্ডিত ও সমৃদ্ধময় হয়ে ওঠে। সখিপুরের বিভিন্ন গ্রামের মানুষের কাছে মাটির ঘর খুবই জনপ্রিয়। পরিবারের পূর্বপুরুষদের ধারাবাহিকতার বংশ পরম্পরায় গ্রামাঞ্চলের মানুষ বর্তমানে তুলনামূলক খুব কমই মাটির ঘরে বসবাস করে। কালের বিবর্তনে আধুনিকতার ছোঁয়ায় এভাবেই হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী  মাটির ঘর। তবে এখনো সখিপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে কিছু কিছু মানুষ মাটির ঘরে বসবাস করছে। মাটির ঘরে বসবাসরত এমন পরিবার বর্তমান সময়ে খুব কমই চোখে পড়ে। সখিপুর উপজেলার কোন কোন মানুষ এখনো মাটির ঘরে বসবাস করছে পরিবারের অতীত স্মৃতি কে আঁকরে ধরে। সখিপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, মাটির ঘরে বসবাস করছে এমন ব্যক্তির সংখ্যা খুবই কম। বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলের কিছু কিছু পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলে জানা যায় ওই সকল পরিবারের পূর্বপুরুষগণ মাটির ঘরেই বসবাস করত।
সখিপুর উপজেলার বহুরিয়া ইউনিয়নের করটিয়াপাড়া গ্রামে, হতেয়া রাজাবাড়ী ইউনিয়নের হতেয়া গ্রামে, গজারিয়া ইউনিয়নের পাথারপুর গ্রামে, দাঁড়িয়াপুর ইউনিয়নের মৌশা গ্রামসহ সখিপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় মাটির ঘর রয়েছে। কিন্তু মাটির ঘরগুলোতে অতীতের মতো সৌন্দর্যের উপস্থিতি খুব একটা অনুভব করা যায় না। কেউ কেউ হয়ত পরিবারের পূর্বপুরষদের স্মৃতি রক্ষার্থে মাটির ঘরগুলো বাড়ীতে স্মৃতি হিসেবে এখনো রেখে দিয়েছে। গ্রামাঞ্চলের কিছু কিছু বাড়ীর মাটির ঘর পরিত্যক্ত পড়ে আছে। আবার কেউ কেউ পরিবারের পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া মাটির ঘরেই বসবাস করছে। মাটির ঘরে অতীতে কেউ কেউ স্বপরিবারে বসবাস করতো আবার কেউবা এখন পরিবারের স্বজনদের অতীত স্মৃতি অটুট রাখতে মাটির ঘর খুব সযত্নে রেখে দিয়েছে। সখিপুর উপজেলার গ্রামে গঞ্জে বিভিন্ন এলাকায় এক সময় মাটির ঘর দেখতে পাওয়া যেত। গ্রামে বসবাসরত পরিবারগুলোর একমাত্র ঠিকানা ছিল মাটির ঘর। মাটির ঘরগুলো মজবুত, টেকসই ও বসবাসের উপযোগী ছিল। মাটির ঘর গুলোর পুরুত্ব ছিল অনেক। এই মাটির ঘর গুলো তৈরিতে ব্যবহার হতো তুষ, চুনা ও মাটি। মাটির সঙ্গে ভালোভাবে তুষ ও চুনাকে মিশিয়ে তারপর কাঠের তৈরি খুঁটিগুলোর উপর দিয়ে মাটি লেপে লেপে নিখুঁতভাবে মাটিরঘরগুলো তৈরি করা হতো। কোথাও কোথাও দেখা যেতো দুইতলা বিশিষ্ট মাটির ঘর। গ্রামের মানুষ দুইতলা বিশিষ্ট মাটির ঘর তৈরি করেও বসবাস করতো। দুই তলা বিশিষ্ট মাটির ঘরগুলোতে কাঠের সিঁড়ি ব্যবহার করা হতো। মাটির ঘর মূলত গ্রামের মানুষের কাছে কোঠা ঘর নামেই বেশ প্রচলিত ছিল। কিন্তু বর্তমানে গ্রামে গঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় মাটির ঘর তেমন একটা চোখে পড়ে না। তবে হঠাৎ কোথাও কোথাও গ্রামেগঞ্জে দেখতে পাওয়া যায় মাটির ঘরগুলো।
গজারিয়া ইউনিয়নের পাথারপুর গ্রামের কৃষক লাল মিয়া বলেন, আমাদের বাড়ীতে বাপ দাদার আমল থেকেই মাটির ঘরে আমরা বসবাস করতাম। তবে বর্তমানে আমরা টিনের ঘরে বসবাস করি। আমার মা বর্তমানে মাটির ঘরেই থাকে। বাপ দাদার স্মৃতি রক্ষার্থে মাটির ঘর রেখে দিয়েছি এবং মাটির ঘর ভেঙ্গে নতুন কোন ঘর দেইনি। আমার মা মাটির ঘরে থাকতেই বেশি পছন্দ করেন।হতেয়া রাজাবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা নিয়ামুল হক বলেন, আমার বাবা দীর্ঘদিন ধরে মাটির ঘরে বসবাস করেছে। ছোটবেলা থেকেই দেখতাম আমার বাবা মাটির ঘরেই বসবাস করত। তীব্র গরমের দিনে মাটির ঘর প্রচন্ড শীতল থাকে।ছোট মৌশা গ্রামের কৃষক মোঃ শহিদুল ইসলাম বলেন, আমার জন্মের পর থেকেই আমি দেখে আসছি আমার বাবা-মা মাটির ঘরে বসবাস করত। আমাদের পারিবারিক ও সংসারের সকল সুখ-দুঃখের কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই মাটির ঘর। যখন ঈদের সময় ঘনিয়ে আসতো তখন আম্মা আব্বাকে দেখতাম সম্পূর্ণ মাটির ঘরটি পুনরায় লেপে দিত। প্রতিবছরের ঈদের আনন্দের সাথে মাটির ঘরের নিখুঁত চাকচিক্যপূর্ণ অপরুপ দৃশ্য আমাদের ঈদের আনন্দকে আরও প্রাণচঞ্চল করে তুলতো।সখিপুর সরকারি কলেজের কলেজের ভূগোল বিষয়ের প্রভাষক মোছা: নাছিমা আক্তার বলেন, মাটির ঘর আমাদের গ্রামাঞ্চলের মানুষের কাছে খুবই জনপ্রিয়। আগেকার দিনে যখন টিনের ঘর এবং দালান কোঠার প্রচলন ছিল না তখন মাটির ঘরেই মানুষ বসবাস করত। আমাদের গ্রামাঞ্চলের মানুষের প্রবাহমান জীবনের গতিধারায়  এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হল মাটির ঘর। বর্তমানে মাটির ঘর তেমন একটা খুব চোখে না পড়লেও গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন জায়গায় দেখা যায় মাটির ঘরেই এখনো কেউ কেউ বসবাস করছে। গ্রামাঞ্চলে মাটির ঘরে বসবাসরত মানুষের মাটির ঘর কে কেন্দ্র করে জীবনের সুখ-দুঃখের অনেক স্মৃতি মিশে রয়েছে।

সংবাদটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরও সংবাদ